Blog Details

তথ্য‌ ‌অধিকার‌ ‌আইন‌ ‌এবং‌ ‌এর‌ ‌প্রয়োগের‌ ‌বাস্তবতা‌

মারিয়া আক্তার, ফেলো, লোকবেতার এফ এম ৯৯. : আরে চাচা আপনি বয়স্কভাতা পাননা ? আপনার তো অনেক বয়স হয়েছে, আপনাদের জন্য বয়স্কভাতার ব্যাবস্থা করেছেন সরকার। 

স্কুলের সামনে দাড়ানো বৃদ্ধ মানুষটিকে এমন প্রশ্নই করছিলো ৮ বছরের এই ছোট স্কুল ছাত্রটি। 

বয়স্কভাতা! হেডা কি বাবা ?

চাচার এমন প্রশ্ন শুনে আমি একটু এগিয়ে গিয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে ধীর গলায় তিনি বললেন “মোর নাম ছক্কাত আলী (রুপক নাম)। বাবা মোর কোন পোলাপান নাই, তোমার চাচীরে লাইয়া বুড়া বুড়ি আশ্রয়নে এউক্কা ঘরে থাহি। মানষের ধারে চাইয়া চিনতা যা পাই হেইয়া দিয়া কোনমতে দিনডা চইল্লা যায়।”

কথার ফাঁকে জানতে পারলাম বয়সের ভারে নুয়েপরা ছক্কাত আলী চাচা ৬৫ বছরে এসেও পাচ্ছেনা বয়স্কভাতা, এমনকি তিনি জানেননা বয়স্কভাতা সম্মন্ধে। ব্যাপারটি দেখে আমি যতটা অবাক হয়েছিলাম তার থেকে অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম।

পাঠকের কাছে এই গল্পে হয়তো একটি ব্যাপার খুব ভালোভাবেই পরিষ্কার যে ছক্কাত আলী চাচার কাছে তথ্যের অভাব রয়েছে।

২০২১ এর এই যুগে এসেও ছক্কাত আলী চাচার মত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষই জানেননা বয়স্কভাতাসহ আরো কি কি সুযোগ সুবিধে রয়েছে।

বরগুনা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে রয়েছে সিটিজেন চার্টার। যেখান থেকে কোথায় গেলে কোন সেবা পাওয়া যাবে, সেটুকু জানা যায়। আবার পাসপোর্ট অফিসে সিটিজেন চার্টার অনুযায়ি সেবা পাওয়া যায়না। কিন্তু সমাজসেবা অফিসে গিয়ে লালবরু পেলো বিধবা ভাতা।

তথ্য আমার অধিকার জানা আছে কি সবার?

২০২১ এর এই শ্লোগানটি এখনও যে পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি সেটা কিন্তু উপরের গল্পের মাধ্যমে অনেকটাই পরিষ্কার। হয়তো আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে তবে বাস্তবতা এমনটাই। 

এবার যেতে চাই মূল কথায় তার আগে পাঠকের কাছে প্রশ্ন রেখে যাচ্ছি ছক্কাত আলীর বয়স্কভাতা না পাওয়ার কারণ কি? আবার লালবরু কিভাবে পেলো বিধবা ভাতা।

উত্তর হিসেবে হয়তো একটা কথাই বলবেন সঠিক তথ্যের প্রয়োগ এবং অজ্ঞতা তবে এজন্য আমার সাথে আপনিও একমত হবেন যে একই সাথে তথ্য জানার আগ্রহও অনেকটি আস্টেপিষ্টে জড়িত।

তথ্য আমার অধিকার জানা আছে কি সবার?

২০২১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরের তথ্য অধিকার দিবসের এক যুগ পুর্তিতে এমন শ্লোগানই উঠে এসেছে। সেই ২০০২ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী ২৮ সেপ্টেম্বর তথ্য জানার অধিকার হিসেবে দিবসটি পালিত হয়েছে। আর সে ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে ইউনেস্কো এবং ২০১৯ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক দিবসটি আন্তজার্তিক সার্বজনীন তথ্যে অভিগম্যতা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে দেশে দেশে পালিত হচ্ছে। 

আন্তজার্তিক তথ্য অধিকার দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “তথ্যের অবাধ প্রবাহকে বিস্তৃত করতে আমরা ১৯৯৫-২০০১ মেয়াদে বাংলাদেশ টেলিভিশনের পাশাপাশি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল চালুর অনুমোদন করি। এ পর্যন্ত ৪৫ টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে ২৮ টি এফএম বেতার কেন্দ্র এবং ৩২ টি কমিউনিটি রেডিও সম্প্রচারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সফলভাবে উৎক্ষেপন করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে টেলিভিশনসহ বেসরকারি টিভি চ্যানেল এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তাদের সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।  ফলে তথ্য প্রকাশ ও প্রচার ব্যাবস্থা সুলভ এবং সহজতর হয়েছে। সংসদ টেলিভিশন চালুর মাধ্যমে সংসদ ধিবেশনের তথ্যাদি গন মানুষের কাছে পৌছানো হচ্ছে।”

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী বিবেক এবং বাক স্বাধীনতা নাগরিকগণের অন্যতম মৌলিক অধিকার। আর সঠিক তথ্য প্রাপ্তির অধিকার চিন্তা, বিবেক এবং বাক স্বাধীনতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০২১ সালের এ পর্যায়ে এসেও অধিকাংশ মানুষেরই সে সম্পর্কে ধারণা নেই বললেই চলে যেমন প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মানুষের মধ্যে তথ্য জানার ব্যাপরে এখনো তেমন কোন আগ্রহই ফুটে ওঠেনি।

কেউ কেউ নিজেদের ভেতরকার ভয়ের জন্যও তথ্য জানতে চায় না, আবার অনেকই সমস্যায় পরতে পারে ভেবে পিছু হটে হয়ে যায়। ফলে তারা দেশের নানা তথ্য এবং অধিকার থেকে বঞ্চিত। আর যার তথ্য নেই তার অধিকার ও নেই বলা চলে অথচ এ জনপদের মানুষজন জানেনও না তথ্য প্রাপ্তির অধিকার জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার।  

তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ এর ৪ (চার) নং ধারায় তা নিশ্চিত করা হয়। এ আইনে বলা হয়েছে, আইনের বিধানবলী সাপেক্ষে, কর্তৃপক্ষের নিকট হতে প্রত্যেক নাগরিকের তথ্য লাভের অধিকার থাকবে এবং কোন নাগরিকের অনুরোধের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাকে তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য থাকবে।

বরগুনা জেলাতে তথ্য অধিকার আইনের উপর কাজ করছে সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমুহ কাজ করে যাচ্ছে। তবে কোন অফিসে তথ্য চাওয়ার নামে হয়রানিও করা হয়েছে বলে এমন প্রমানও কিন্তু মিলেছে বরগুনাতে। আবার এমন কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যারা জনসস্পৃক্ত কাজ করছেন এবং যাদের তথ্য দেওয়ার জন্য জনবল এবং সদিচ্ছা আছে কিন্তু তথ্য নেওয়ার মানুষ নেই। 

জনগণের তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগ প্রথমে তথ্য জানার জন্য সচেতন হতে হবে। তথ্য অধিকার নিশ্চিত করতে এক সাথে কাজ করতে হবে এবং এর মধ্য দিয়েই এসডিজি অভিষ্ট ১৬.১০ বাস্তবায়ন সম্ভব বলে ধারণা করছেন সচেতন মহল। 

মোট কথা সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই,তথ্য হোক সবার অধিকার। তথ্য এখন গল্পের সেই আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ। যার আছে সঠিক তথ্য সে নয় কোনো ভুল তথ্যে আবধ্য। 

মারিয়া আক্তার, ফেলো, লোকবেতার এফ এম ৯৯.

Leave a Reply

%d bloggers like this:

developed by:Md Nasir