Blog Details

বরগুনা জেলা কারাগারে চলছে নানা অপকর্ম

বরগুনা জেলা কারাগারে চলছে নানা অপকর্ম

লোকবেতার ডেস্ক : বরগুনা জেলা কারাগারে নানা অপকর্ম চলছে। ডেপুটি জেলার (ভারপ্রাপ্ত জেলার) ইফতেখার ইউসুফের নেতৃত্বে হাবিলদার আব্দুর রহমান, সহকারী প্রধান কারারক্ষী মাসুম, কারারক্ষী অনুপ কুমার ও জিল্লুর রহমানসহ কয়েকজন শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে অপকর্ম করছেন। কারাগারে অনিয়মের প্রতিবাদ করলেই বন্দিকে পুকুরে নামিয়ে শাস্তি দেওয়া হয়। নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এক বন্দি নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে ওই বন্দির ক্ষতস্থানে লবণ ও মরিচের গুঁড়া দিয়ে আরও নির্যাতন করা হয়। তদন্ত কমিটির কাছে কারাগারের ডিপ্লোমা নার্স আফজালুর রহমান এমন সব তথ্য তুলে ধরেন।

তদন্ত কমিটির সভাপতি ও পিরোজপুরের জেল সুপারের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে নার্স আফজাল আরও বলেন, কারা চিকিৎসকের পক্ষ থেকে গুরুতর রোগীকে জরুরি ভিত্তিতে বাইরের কোনো হাসপাতালে পাঠানোর সুপারিশ করা হলেও তা বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ করা হয়। গত বছরের জুনে তদন্ত কমিটিকে তিনি আরও বলেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। উলটো অভিযোগকারীকে হয়রানি করা হচ্ছে। সম্প্রতি আফজালুর রহমানের বদলির আদেশকে হয়রানিমূলক উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ৩ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী খন্দকার মোহাম্মদ মুশফিকুল হুদা নোটিশটি দেন।

আফজালুর রহমান বলেন, কারাগারে মারধর করার কারণে ২৬ জুন বন্দি রাকিব গলায় নিজে ছুরি চালান। তখন তাকে হাসপাতালে আনা হয়। আমার সামনে তার গলায় লবণ ও মরিচের গুঁড়া দেওয়া হয়। এতে তার অবস্থা আরও খারাপ হয়। তার গলা পরিষ্কার করতে চাইলে জেলার ও তার সহযোগীরা তাতে কর্ণপাত করেননি। উলটো বন্দিকে লাথি ও কিল-ঘুসি মারা যায়। বিষয়টি আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারি-এমন আশঙ্কায় উচ্চপর্যায়ে আমার বিরুদ্ধে তারা বানোয়াট অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের জন্য আমি বরিশালের ডিআইজিকে (প্রিজন্স) চিঠি দিই। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত হয়। তদন্তে আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং অভিযোগকারীদের নানা অপকর্ম উঠে আসে। তিনি আরও বলেন, কারা অভ্যন্তরে সিন্ডিকেট সদস্যরা বন্দি ও স্টাফদের জিম্মি করে স্বার্থ হাসিল করছে। বিষয়গুলো সময়ে সময়ে সাবেক আইজিকে (প্রিজন্স) জানিয়েছি। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

লিখিত জবানবন্দিতে আফজাল উল্লেখ করেন-বরগুনা কারাগারে বন্দি মিন্টু আকন কিডনি রোগী। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। ২৫ জুন রাতে সহকারী সার্জন তাকে দ্রুত বরগুনা সদর হাসপাতালে ভর্তির রেফার করেন। কিন্তু পরদিন তাকে বরগুনা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, কিছু বয়স্ক বন্দির সময়ে সময়ে চেকআপ ও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত জেলার আমাকে (আফজাল) বলেন, ‘কোনো বন্দিকে বাইরের হাসপাতালে রেফার অথবা কারা হাসপাতালে ভর্তি করা যাবে না।’ আফজাল আরও বলেন, অনিয়মের প্রতিবাদ করায় হাজতি নাজমুলের মাধ্যমে আমার (আফজাল) ওপর হামলা চালানো হয়। তিনি বলেন, সিন্ডিকেট সদস্যরা একটি চেইন মেনটেইন করে চলেন। অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত হলেও জেলা-জেল সুপারদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বরং নিচের স্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তদন্ত হলে সত্য বেরিয়ে আসবে।

বরগুনা কারাগার-সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির সভাপতি ও পিরোজপুরের জেল সুপার শামীম ইকবাল বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। আফজালুর রহমানের সব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে অনেক অভিযোগের সত্যতা আছে। যে বন্দির বিরুদ্ধে আফজালের ওপর হামলার অভিযোগ করা হয়েছে সেই বন্দির খুব একটা দোষ নেই। এক বা একাধিক কারা কর্মকর্তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি মূলত হামলা করতে উদ্যত হয়েছিলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কমিটির সভাপতি শামীম ইকবাল বলেন, নানা কারণে আমরা পদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি না। তাই বাধ্য হয়ে অনেক সময় নিচের স্তরের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

বরগুনা জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার ইফতেখার ইউসুফ বলেন, বন্দি নির্যাতন এবং রোগীর বিষয়ে আফজালুর রহমানের দেওয়া জবানবন্দিতে মিথ্যাচার করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা কারাগারে ঘটে না। আর চিকিৎসার বিষয় চিকিৎসক-নার্সরা দেখেন। ওইসব বিষয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আফজাল বন্দিদের ঠিকমতো দেখাশোনা করেন না। চেইন অব কমান্ড তিনি মানতে চান না। এসব বলার কারণেই ক্ষুব্ধ হয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, কোনো বন্দি যাতে কারাগারে চিকিৎসার অভাবে না ভোগের সে বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষ সব সময় তৎপর।

বরিশালের ডিআইজি (প্রিজন্স) টিপু সুলতান জানান, তদন্ত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বরগুনা জেলা কারাগারের কয়েকজন কারারক্ষীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা কাগজপত্র না দেখে বলা যাবে না। তিনি আরও বলেন, কেউ লিখিত জবানবন্দি দিলেই তা শতভাগ সত্য মনে করার কোনো অবকাশ নেই। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

Leave a Reply

%d bloggers like this:

developed by:Md Nasir