Blog Details

পাখির বাড়ি

পাখির বাড়ি

জাকির হোসেন, আমতলী : বকের ক্রাক …ক্রাক, পানকৌড়ির খট…খট, চড়ুই, শালিক আর বাদুরের কিচির মিচির শব্দে দিন রাত মুখরিত থাকে আমতলী পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের সবুজ ছায়া ঘেরা সুকুমার হাওলাদারের বাড়িটি। পাখির প্রতি সুকুমারের ভালোবাসাও অনেক। নিজের পুকুরের মাছ খেতে দেন পাখিদের। সুকুমারের ভালোবাসায় এই বাড়ির পাখিদের শিকার কিংবা কেউ জ্বালাতন করতে পারে না। এই বাড়িটি এখন সকলের কাছে পাখি প্রেমি বাড়ি হিসেবে পরিচিত। পাখিরাও এখন নির্ভয়ে বসবাস করে এই বাড়িতে। বাড়িটি এখন পাখিদের স্বর্গরাজ্যে পরিনত হয়েছে।

প্রায় এক যুগ আগে ২০১০ সালে প্রথমে সুকুমার হাওলাদারের বাড়িতে কয়েকটি বাদুর এসে বসবাস শুরু করে। এক বছরের মাথায় তা প্রায় কয়েক হাজার বাদুরের বাড়িতে পরিনত হয়। এর পর আসতে থাকে বক আর পান কৌড়ি। বাড়ির পেছনের উঁচু রেন্ট্রি, বাদাম, কড়াই আর চাম্বল গাছে হাজার হাজার বাদুরের সাথে শত শত বক আর পান কৌড়িতে ভরে যায়। পাখির প্রতি সুকুমার সরকারের ভালোবাসা আর নির্ভরতা পেয়ে প্রতি বছর বাড়তে থাকে পাখির সংখ্যা। প্রতি বছর মে-জুন মাসের দিকে পান কৌড়ি আর বক এসে এই বাড়ির গাছে বাসা করে ডিম দিয়ে ছা ফোটায়। পানকৌড়ি এবং বক ছা ফোটানোর পর বাচ্চাদের খবারের সংকট দেখা দেয়। এই সংকট মোকাবেলার জন্য সুকুমার তার বড়ির পেছনের পুকুরটি মাছ চাষ করে তা নিজেরা না খেয়ে পাখিদের জন্য উন্মুক্ত করে রেখেছেন। ফলে দল বেঁধে পান কৌড়ি এবং বকের দল এই পুকুরে নেমে মাছ শিকার করে তা বাচ্চাদের নিয়ে খাওয়ান। প্রতি বছর মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত চলে এই বাড়িতে পাখির মেলা। বাচ্চা বড় করে পানকৌড়ি আর বক চলে গেলেও বাদুর , শালিক ও চড়ুই থাকে বারো মাস।

বুধবার সকালে সুকুমার সরকারের বাড়ি সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বিশাল বাড়ি। বাড়ির সামনে পাঁকা ভবন আর পিছনের অংশে বড় প্রজাতির উঁচু রেন্টি কড়াই আর চাম্বল গাছে ভরা। সকল গাছেই ঝুলছে বাদুর। তারা যেন সার্বক্ষনিক কিচির মিচির শব্দ করে বেরাচ্ছেন। রেন্টি গাছের উঁচু মগ ডালে শারি শারি বক আর পান কৌরির বাসা। অনেক বাসায় বকের বাচ্চা ফুটেছে। কিছু কিছু বাসায় মা বক আর পানকৌড়ি ডিমে তা দিচ্ছে। গাছের নীচে তলায় বাদুরের মলে ভরে গেছে। বকের সাদা বিষ্টায় গাছের সকল পাতা সাদা রং ধারন করেছে। মা বক আর পান কৌরি কিছুক্ষন পর পর উড়ে যাচ্ছে তার প্রিয় সন্তানদের জন্য খাবারের খোজে। কখনো বা সুকুমার হাওলাদার পুকুরে আবার কখনো বা পাশের লেকে পান কৌড়ি সাঁতার কেটে আর বক কিনার থেকে মাছ ধরে এনে ছানাদের মুখে তুলে দিচ্ছেন। এ এক অভাবনীয় দৃশ্য। মায়ের ভালোবাসার খাবার পেয়ে কিছুক্ষণ নিরব থাকলেও আবার কিচির মিচির করে ডেকে উঠছেন খাবারের জন্য।

বাড়ির মালিক সুকুমার হাওলাদার জানান, ২০১২ সাল থেকে এই বাড়িতে পাখি আশ্রয় নিয়ে এখন নিয়মিত বসবাস করে আসছে। এই বাড়ির সবাই এখন পাখির প্রেমে পড়ে গেছে। সবাই পাখিকে ভালো বাসে। পাখির কষ্টে সবাই ব্যাথিত হয়। এই বাড়িতে পাখি শিকার কিংবা পাখি জালাতন সাবার জন্য নিষিদ্ধ। তিনি আরো জানান, আমাদের বাড়ির একটি পুকুরে মাছ চাষ করে তা পাখির খাবারের জন্য উম্মুক্ত করে রেখেছি। যখন যে পাখির খাবারের প্রয়োজন তখন সে পাখি এই পুকুর থেকে খাবার ধরে খেয়ে থাকেন। তিনি আরো জানান, এক সময় বাড়ির সবাই মিলে বাড়ির পেছনের বড় বড় গাছ কেটে সেখানে ভবন নির্মানের সিদান্ত নিয়েছিল। কিন্ত আমি পাখির বসবাসের কথা চিন্তা করে গাছ গাটা বন্ধ করি। পিছনে ভবন না করে সামনের অংশে ভবন করি। যার ফলে রক্ষা হয় পাখির আশ্রয়স্থল।

তিনি আরো বলেন, একবার রাতের ঝড়ে দুটি বকের ছানা নীচে পড়ে গিয়েছি। সকালে আমি বাগানে হাটতে গিয়ে ছানা দুটিকে দেখতে পেয়ে বাসায় এনে লালন পালন করে বড় করেছি। সুস্থ হওয়ার পর তাদের বাগানে আবার ছেড়ে দেই। এতে বেঁচে যায় ছানা দুটি।

প্রতিবেশী ধিরাজ বিশ্বাস জানান, সুকুমার হাওলাদার তার বাড়িতে পাখির জন্য অভায়শ্রম গড়ে তুলেছেন। নি:সন্দেহে এটি একটি ভালো কাজ। পাখির প্রতি তার ভালোবাসা দেখে আমরাও তার এই কাজে সহযোগিতা করি। এই বাড়িতে এসে কেউ পাখি শিকার কিংবা জালাতন করতে পারে না। আমরা সকলে মিলে বাঁধা দেই। আমরা পারার সবাই যেন সুকুমার হাওলাদারের মত পাখির প্রেমে পরে গেছি।

আরেক প্রতিবেশী হরি গোপাল পাল বলেন, পাখির প্রতি সুকুমার সরকারের ভালোবাসা দেখে আমরাও মুগ্ধ হই। সুকুমার সরকারের বাড়িসহ আশপাশের আমাদের বাড়ির গাছপালাও এখন পাখিতে ভরা থাকে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর আনম আমিনুর রহমান বলেন, বক ও পানকৌড়ি দল বেধে এক সাথে উঁচু গাছের মগডালে বসবাস করে। বাংলাদেশে ১৮ প্রজাতির বক রয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল অঞ্চলে সাধারনত বড় সাদা বক দেখা যায়। এরা সারা বছর ডিম দেয় এবং বাচ্চা ফোটায়। এরা সাধারনত ৩-৬ টি ডিম দেয়। ২০-২৬ দিনের মধ্যে বাচ্চা ফোটায়। পুরুষ এবং স্ত্রী বক মিলে ডিমে তা দেয় এবং বাচ্চা লালন পালন করে। বাচ্চা ফোটার পর ২-৩ সপ্তাহ বাচ্চা বাসায় হাটাহাটি করে। ৪০-৪৫ দিনের মধ্যে তারা উড়ে যেতে সক্ষম হয়। বক সাধারনত ৯-১০ বছর বেঁচে থাকে। এদের প্রধান খাবার হচ্ছে মাছ, পোকা মাকর। বাংলাদেশে ৩ প্রকারের পাণকৌরি দেখা যায়। এর মধ্যে আকারে ছোট পানকৌড়ি দক্ষিনাঞ্চলে বেশী বসবাস করে। এরা সাধরনত বকের সাথে দল বেধে একত্রে উচু গাছের মগডালে বাসা করে। মে -থেকে জুলাই মাসে এরা ডিম দেয়। এরা সাধারনত ২-৬ টি পর্যন্ত ডিম দেয়। ১৫-২১ দিনের মধ্যে ডিম ফোটায়। পুরুষ এবং স্ত্রী পানকৌরি পালা করে ডিমে তা দেয় এবং বাচ্চা লালন পালন করে। ৩০ দিনের মধ্যে বাচ্চা বড় হয়ে উড়ে যেতে সক্ষম হয়। এদের প্রধান খাবার হচ্ছে মাছ ব্যাঙ। পানকৌরি ৮-৯ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। তিনি আরো বলেন, যেখানে মানুষ জালাতন করে না সেখানে পানকৌড়ি, বক এবং বাদুর থাকতে পছন্দ করে।

Leave a Reply

%d bloggers like this:

developed by:Md Nasir